দিনের শেষে রাত আর রাতের শেষে দিন। এভাবেই প্রতি রাতের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে চিরচেনা সেই ঢাকা শহরটি আবার ব্যস্ত হয়ে উঠে, কোলাহলে মেতে উঠে পুরো শহর। এই কোলাহলে প্রতিদিনের মতো আজও ঘুম ভাঙে জরির। ঘুমটা নিজ থেকে ভাঙেনি। ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে ওর অসুস্থ মা। জরি অবশ্য ঘুমাতে খুবই ভালোবাসে। কেননা ঘুম ভাঙলেই ওর ক্ষিদের জ্বালাটা তীব্র হয়ে ওঠে যা ওর জন্য খুবই কষ্টদায়ক।
বয়স কতো হবে জরির? সাত বা আট। তবে এই বয়সে অন্যান্য শিশুর মতো পুষ্টিকর খাদ্য, ভালো পোশাক, খেলনা কিছুই সে পায়না। এসব কিনে দেয়ার সামর্থ্য তার মায়ের নেই। যদিও এ দায়িত্বটা বাবার উপর থাকে। কিন্তু জরির পৃথিবীর পুরোটা জুড়ে শুধু ওর মা। জরিরও কিন্তু ভালো একটা পরিবার ছিল। জরির বাবা একটি চাকরি করতো। স্বল্প আয়ে তাদের সংসার খুব ভালই চলছিলো। কিন্তু জরির বয়স যখন ৩ বছর, তখন তার বাবা তাদের রেখে চলে যায়। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য জরিকে নিয়ে পথে নামে তার মা। সেই ৩ বছরের জরিই আজ ৭ বছর বয়সি হয়ে গেছে। এখন জরি তার মাকে নিয়ে এই ঢাকাতেই কোনো এক ফুটপাতে রাতে মাথা গোজার ঠাই করে নিয়েছে।
বেলা বেড়ে যাচ্ছে, জরিকে এখনই একটি বস্তা নিয়ে বের হতে হবে, যদিও বস্তাটা তার তুলনায় বড়। ঘুরবে এই রাস্তা থেকে ওই রাস্তা,এই ডাস্টবিন থেকে ওই ডাস্টবিন। আমাদের শহরের প্রচলিত ভাষায় যাকে বলা হয় “টোকাই”....
আজ ২৫ তম রোজা, জরি ৬ টি রোজা রেখেছিল। অনেক কষ্ট হয়েছিল তার। সেহেরির সময় একটা শুকনো রুটির অর্ধেকটা ও খায় আর বাকিটুকু ওর মা। বাকি ক্ষিধাটুকু সে কল থেকে পানি খেয়েই মিটিয়ে নেয়। তারপর ইফতারির সময় শুধু পানি, আর মাঝেমাঝে ভাগ্যে জোটে একটি রুটি। বেশী কষ্ট হয় বলে ওর মা ওকে বাকি রোজা গুলো রাখতে দেয় নি।
রাস্তায় হাটতে হাটতে হঠাৎই একটি বড় শপিংমল এর দিকে জরির চোখ পড়ে। খুব সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে। ভেতরে নানান রঙের কাপড় সাজানো। জরি ভেতরে যাওয়ার সাহস পায়না, ময়লা কাপড়ে দেখলে যদি তাকে মেরে তাড়িয়ে দেয়। তবে সে নিয়ে জরির কোনো দুঃখ নেই। কাধে ঝোলানো বস্তাটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলতে থাকে, ‘‘আচ্ছা ওগুলো বিক্রি করলে ২০ টাকা পাবো তা দিয়ে কি আমার জন্য একটা জামা কেনা যাবে?
নাহ্ থাক, আমার জন্য না মায়ের জন্য একটা শাড়ী কিনতে পারলে...’’
হঠাৎই কারো চিৎকার এ জরির ভাবনায় ছেদ পড়ে। পেছনে তাকাতেই দেখে এক সাহেব তাকে বলছে...
-এই টোকাই এর বাচ্চা এখানে কি? যা এখান থেকে।
লোকটা ওকে তেড়ে মারতেও আসে কিন্তু গায়ে ময়লা কাপড় থাকায় জরি মার খাওয়া থেকে বেঁচে যায়। সে মাথা নিচু করে হাটতে থাকে। গন্তব্য সেই ফুটপাত, মায়ের কাছে ফিরে যাচ্ছে সে।
ফুটপাতে ফিরে মায়ের কাছে টাকাটা দিয়েই কংক্রিটের তৈরী ফুটপাতে একটি পুরনো ছেড়া কাথা বিছিয়ে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পরে সে। চোখে ঘুম আর তার মাঝে বিরাজমান হাজারো স্বপ্ন। স্বপ্নে সে মায়ের সাথে ভেসে বেরায় পুরো শহর। বাস্তবে অসম্ভব বিষয়গুলোই স্বপ্নে সম্ভব হয়ে ধরা দেয় ওর কাছে। হঠাৎই শরীরে একটা ঝাঁকুনি অনুভব করে। হ্যা আর কিছু নয়, তার মা তাকে ডাকছে, সকাল হয়ে গেছে। আবার জীবনযুদ্ধে নামতে হবে এই ক্ষুদে যোদ্ধাকে।
এমনি করেই এক একটা দিন শেষ হয় যায় জরির। মায়ের মুখে শুনেছে আগামীকাল নাকি ঈদ। রাস্তায় বের হয়ে জরি দেখে সবাই শেষ মুহূর্তে ঈদের কেনাকাটা করতে ব্যস্ত। এসব দেখতে দেখতে জরির মনটা খারাপ হয়ে যায়। বিকেলে জরি মার্কেট থেকে একটু দূরে দাড়িয়ে বাচ্চাদের আনন্দ উল্লাস দেখতে থাকে। তার অজান্তেই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ কাধে হাতের স্পর্শ পেয়ে জরি চমকে উঠে। পেছনে তাকিয়ে দেখে এক ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
পিছনে ফিরতেই ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে....
- কিরে নিবি? অমন একটা জামা।
জরি- কে কিন্না দিবো?? আমার তো কেউ এ নাই মা ছাড়া।
ছেলেটি- আয় আমার সাথে।
ছেলেটি জরিকে নিয়ে মার্কেট এ ঢোকে। সেখানকারই একটি দোকান থেকে লাল টুকটুকে একটি জামা কিনে দেয় জরিকে। জরি বুঝতে পারে না সে কি সপ্ন দেখছে নাকি সত্যি ই......
ছেলেটার ডাকে ঘোর কাটে তার। জরির হাতে ৩০০ টাকা দিয়ে বলে এই নে, তোর মাকে বলবি আগামিকাল সেমাই রান্না করতে। বলেই ছেলেটি চলে যায়। জরি একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ছেলেটির চলে যাওয়া দেখে। ছেলেটি চোখের আড়াল হতেই জরি রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকে, অনেক অনেক খুশি সে।
দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা যে ফুটপাতে রাতে ঘুমায় সেটার অনেকটা কাছে চলে আসে জরি, এখানেই তো ওর মা বসে থাকে। হয়তো ওর মা ওকে আজ তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে দেখে একটু অবাক হবে, তাতে কি? সে আজ অনেক খুশি।
হ্যা জরি পৌছে গেছে প্রায়। রাস্তা পাড় হওয়ার জন্য রাস্তায় নামে সে। রাস্তার ওপাশ থেকে জরির মা ও তাকিয়ে আছে জরির দিকে। কিন্তু আজকে তার চাহনিটা একটু অন্যরকম। যেনো অজানা এক আশংকায় ছেয়ে গেছে তার মন। হঠাৎই জরির মায়ের চোখদুটো অস্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে যায়। জরি বুঝতে পারেনা কি হয়েছে, কেনই বা তার মা এভাবে তাকিয়ে আছে। কারণ খোজার চেষ্টা করে সে। তবে তার আগেই ছোট্ট জরির গলা চিড়ে বেরিয়ে আসে চিৎকার।
জরির মা অসুস্থ শরীর নিয়েই “জরিইইইইই” বলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে আসে। জরি রক্ত মাখা শরীরটা রাস্তায় পড়ে আছে,হাতে সেই ৩০০ টাকা আর রক্ত মাখা লাল জামাটি।
হ্যাঁ,একটু আগেই একটি মালবাহী ট্রাক জরিকে ধাক্কা দেয়। জরির রোগা শরীরটা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ে রাস্তার উপড়। ট্রাকটি শুধু জরিকেই নয় বরং তার নতুন কাপড় পড়ে ঈদ করার স্বপ্নটাকেও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। আর এভাবেই ভেঙে যায় এক পথশিশুর স্বপ্ন............