“বাজান, আর কদ্দূর? দুইদিন ধইরা না খাইয়া ধলেশ্বরীর পেটে ভাসতাছি। অথচ ধলেশ্বরীর পেট ভইরা আছে লাশে!”
“আর দুইডা ঘাঁটিতে আক্রমণ করলেই শেষ। হেরপর স্বাধীন দেশে বাপ পোলা মিল্লা পেট ভইরা খামুরে, পোকা।”
কাকজ্যোৎস্না রাতে পেছন থেকে এ ধরনের আক্রমণের প্রত্যাশা করেনি খাতির জমা অবসন্ন আর্মিরা। চোখে একেবারে সরষে ফুল দেখে মরতে হলো ভুঁইফোঁড় লোহার টুপিওয়ালাদের। বাপ বেটাকে প্রতিহত করতে গিয়ে খাবি খেয়ে যায় মিলিটারি রুই কাতলরা। ধলেশ্বরীর পেট আবারও ভরে উঠেছে ভিনদেশী দস্যুদের লাশে। স্রোতঃস্বতী নধরদেহী নদীতে কচুপাতার জলের মতো মিলিয়ে পড়ে লাশের পর লাশ। তবে লাশগুলোকে ধলেশ্বরী তার পেটে ধারণ করতে চায় না। কিন্তু কেন! নদী কি কথা বলতে জানে! অথচ বাপ-বেটা দিব্যি কথা বলে নধরদেহী ধলেশ্বরীর সাথে। ধলেশ্বরীর তরঙ্গশীর্ষে স্পষ্ট হাসির নহবত। স্রোতের টানে কচুরিপানার দলের সাথে তৃণাবর্তে মিলিয়ে পড়ে সবকিছু। পাকিস্তানি মিলিটারিদের রক্তের লাল লীন হয়ে যায় ধলেশ্বরীর নীলে। অথচ স্থির থাকে ওদের আলুথালু একপায়িটা। বাওটা খুশিতে মাথা নাড়ে। নৌকার বাওটাকে পোকা বলে নড়ির পা; ডিঙির নাম রেখেছে একপায়ি। নির্বিঘ্নে স্রোতের বিপরীতে একপায়িকে নিয়ে টক্কর দিয়ে পথ পাড়ি দেয় ওরা।

ও নিজেও শিখে গেছে কিভাবে কথা বলতে হয় ধলেশ্বরীর জলপ্রবাহের সাথে। ও বলে, ধলেশ্বরী কথা বলে, জল তার টলটলে; দস্যুদের দিব মার, টনক নড়বে এইবার। এইতো আর মাত্র ক\'টা দিন, দেশটা স্বাধীন হলে ও আগের মত ধলেশ্বরীর পিঠে সাঁতার কাটবে, গাছে উঠে বুড়ি নাচন দিবে, কানামাছি খেলবে, শিঙি মাছ ধরবে, এলেবেলে খেলবে, কড়িগাঁট্টা খাবে, জালপাদ বালিহাঁস ধরবে। যেদিন থেকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা চরে ঘাঁটি গেড়েছে, সেদিন থেকে ও এলেবেলে খেলতে পারে না। অথচ মাস চারেক আগেও মিচকি, শিমুদের সাথে এলেবেলে খেলেছে ও। সবাই বলে ও নাকি এলেবেলে খেলার রাজা। চুমকি বলে ও নাকি বিল কুমিরের ছাও। ও যখন নেউলের মত গাছের উপর উঠে বসে, তখন চুমকি ওকে খেপায় এই বলে, \"বান্দর, বান্দর টেসকি, তোর ছিঁড়া লুঙ্গি দেসকি!\" চুমকির কথায় ওর রাগ হয় না। গাছ থেকে এক লাফে নদীতে ডুব দেওয়ার আগে ও বলে, \"এইডা অইলো এলা, আমার লগে খেলা।\" এখন ও অবশ্য পাকিস্তানি দস্যুদের সাথে এলেবেলে খেলতে চায়। গাঁয়ের ঝাল ঝেড়ে ও এক হাত নিতে চায়। ও স্বপ্ন দেখে এক ডুব দিয়ে ও নিঃশেষ করে ফেলেছে পাকিস্তানি দস্যুদের ঘাঁটি।

খিদের যন্ত্রণা কলিজায় হাতুড়ি মারতেই ও বলে উঠে, \"আর কুলাইতে পারি না, আব্বা। হুদা পানি খাইয়া কয়দিন আর বাঁচোন যায়।\" আশেপাশে নিবিড় দৃষ্টিতে বাবা তাকিয়ে দেখে সবকিছুই শেষ। বাবা কাঁদে, কিন্তু চোখের জল ছেঁড়া লুঙ্গিতে পড়বার আগেই মনটাকে শক্ত করে ফেলে বাবা। মানুষগুলো নাই, পালিয়ে গিয়েছিল যারা তারাই বেঁচে গেছে। ফসল, মাঠ, গবাদিপশু, বাড়িঘর সবকিছু শেষ করে দিয়েছে দস্যুদের দল। পরমকতায় পারু মিয়া দাদার মুখে শুনেছে বর্গী দস্যুদের কথা। কিন্তু পাকিস্তানি দস্যুদল যে বর্গীদের চেয়েও হিংস্র। ঝোপের ডাল থেকে একটা পাকনা খাইল্যা ছেলেকে দিয়ে বলে, \"চাবাইতে থাক, পোকা। দেখবি আওখের মতন লাগে।\" পারু মিয়া ভাবতে থাকে কিভাবে গ্রামের মানুষ, বাজার, ঘরবাড়ি, ধানখেত, বাগান সবকিছু বিনষ্ট করে দিয়েছে পাকিস্তানি দস্যু দলেরা। সব ছিল তুলসী বনের বাঘ রাজাকার বাহিনীর কাণ্ড। শুঁড়ির সাক্ষী রাজাকার। কিন্তু কেনো ওরা এমনটা করলো! দেশের খেয়ে, দেশের পড়ে কি দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা যায়! কিন্তু ওরা যে পারে।

রাজাকারের দল সবকিছুই পারে। মনটা ভীষণ হেঁড়ে হয়ে উঠে তখন, যখন বউ আর বেটির কথা ভাবে। নিলুফা কত স্বাদের বিবি তার! আর মাইয়্যাডা, লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি লায়লার। এক রাতেই অমরাবতী গ্রামটা নরক হয়ে গেলো! একটা সময় ওরা নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য খুব আফসোস করতো। কিন্তু এখন আফসোস নেই আর। ওরা দেখে নিখাদ আপোষের স্বপ্ন। দেশটাকে স্বাধীন করতেই হবে, তবেই মুক্তি শান্তি পাবে শহিদের আত্মারা। পাকিস্তানিরা ওদের শত্রু। তার চেয়েও বড় শত্রু ঢাকের কাঠি মানুষরূপী রাজাকার বাহিনী। আর জিততে ওদেরকে হবেই। ওরা জিতলেই জিতে যাবে দেশ।
সেদিন রাতে ধলেশ্বরী বাপ-বেটাকে বলেছিল, বীরাঙ্গনাদের জীবন হরণকারী ডাকাতদের লাশের স্থান আমার পেট না, ওদের জায়গা হচ্ছে জাহান্নাম। বীরাঙ্গনা কারা পোকা বোঝেনা। ওর বয়স এগারো বছর চার মাস। ঠিক চার মাস আগে জন্মদিনের দিন চুমকি ওকে একটা লাল লুঙ্গি উপহার দিয়েছিল। কিন্তু চুমকি কোথায়, তা ও ঠিক জানে না। শুনেছে চুমকি নাকি মায়ের সাথে ভারতে চলে গেছে। ও ভাবে নদীর ওপারে যেখানটায় গরম সূর্য মুখ চুইয়ে পড়ে, সেখানটাতেই ভারত। ও স্বপ্ন দেখে দেশটা স্বাধীন হলে এক ডুবে ও ভারত চলে যাবে। চুমকিকে বালিহাঁস দিয়ে নিয়ে আসবে স্বাধীন দেশে। বালিহাঁস নাকি চুমকির খুব প্রিয়। সেদিন পড়ন্ত বিকেলে ওকে ডাকতে থাকে বাবা, “এইনো দেক পোকা। লাশ, আরেকটা লাশ। বুকে দেশের পতাকা। মুন্সীগঞ্জের দিক থেইকা আইছে। এইডা মুক্তিযোদ্ধার লাশ। আয় এরে কবর দেই।” ওরা লাশটাকে সযত্নে টেকের জঙ্গলে কবর দিয়ে বলে, শহিদের লাশ সম্মানের সাথে কবর দেওয়াও মুক্তিযোদ্ধাগো দায়িত্ব।

গতকাল রাতেই পূর্ব দিকের ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়েছে ওরা। একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছে পাকিস্তানি দস্যুদলের আখড়া। কিন্তু আরও একটা আছে। এটা শেষ করলেই শেষ। ওরা ভাবতে লাগে সেদিনের কথা৷ সেদিন তো ওরাও শেষ হয়ে যেতে পারতো পাকিস্তানি দস্যুদের বুলেটের স্রোতে। কিন্তু ধলেশ্বরীর স্রোত যে ওদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ধলেশ্বরীর গেরিলা বাহিনী সমরকেন্দ্রে আক্রমণ করতেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন শমসের আলীসহ বন্দর শহরের মিলিটারি বাহিনী। বিজয় সুনিশ্চিত। কিন্তু দুমুখো সাপ রাজাকার বাহিনী পাকিস্তানিসহ নিজেদেরকে সমর্পণ করার ফন্দি এঁটে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বড় চাল চালে। সমর্পণ করার নামে অতর্কিত হামলা চালায় ডাকাবুকো দেশপ্রেমিকদের উপর। শুধু তাই না, সেদিন রাতে গ্রামে নির্বিচারে গণহত্যাও চালিয়েছে পাকিস্তানি নরপশুরা। বাপ বেটা একদিন আগে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাছ ধরতে গিয়েছিল দূরে মেঘনা নদীর মোহনায়। আর ফিরে এসে দেখে সবকিছুই লুষ্ঠিত। অবশ্য সেদিনের পর থেকে পাকিস্তানিরা ভেবেছিল চর ধলেশ্বরীতে বুঝি আর কেউ বেঁচে নেই। তাই অল্প কয়েকজন সৈনিক আর রাজাকারদের নিয়ে তিনটি ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল এখানে। ধলেশ্বরী চর স্থল থেকে বিছিন্ন, বন-জঙ্গলে আচ্ছন্ন অনেকটা বন্ধুর পথ।

বাপ-বেটা মিলে দুইটা ঘাঁটি বিনাশ করে ফেলেছে। এবারে পশ্চিমে সদর ঘেঁষা ঘাঁটিতে আক্রমণ চালাতে পারলেই শেষ। তারপর দিগন্তপ্রসারী শীতলক্ষ্যা নদী। পাকিস্তানিদের সাধ্য নেই মৃত্যুর ঢেউ ঠেলে আবারও চরে ভিড়ে। তবে সেখানে বিপদ অনেক বেশি। রাজাকার বাহিনী ও মিলিটারি আর্মিরা একাকার হয়ে পাহারা দেয় নদীর সীমান্ত। তাতে কি! ওদের কাছে লাঠি আছে, কড়ই গাছের বল্লম আছে, খোকা পাখি আছে; আছে মাছরাঙার ছোঁচালো মুখ; সবচেয়ে বড় শক্তি আছে ‘দেশপ্রেম’। গোলাবারুদ সহ দুইটা পিস্তলও আছে ওদের। প্রথম ঘাঁটি আক্রমণ করতে গিয়ে পাকিস্তানিদেরকে মেরে উদ্ধার করে এনেছে দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা পোকা।

তাইতো খুব সহজেই উড়িয়ে দিতে পেরেছে দ্বিতীয় ঘাঁটিটা। পারু মিয়া আগে মাছ মারতো, এখন মারে পাকিস্তানি দস্যু ও মীরজাফরদের। এর আগে পোকার শক্ত বল্লমের আঘাতে রাজাকার পিচ্চি প্রাণ হারিয়েছে। রাজাকার পিচ্চিকে মেরে ও বলেছিল, “এইডা অইলো এলা, আমার লগে খেলা।” কিন্তু পিচ্চির সাধ্য কি ওর সাথে খেলে! পোকা পিস্তল চালাতে জানে না। পিস্তল অনেক ভারী। অবশ্য বাবা পারে। এর আগে তিনি শিখেছিলেন। নৌ-ডাকাতদের থেকে বাঁচতে বাবার কাছ থেকেই পিস্তল চালনা শিখেছিল পারু মিয়া।

স্রোতের অনুকূলে সন্তর্পণে এগুতে থাকে একপায়ি। পোকা পুত পুত শব্দ শুনে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, এই পাখিরা পুত পুত করে কেন গো আব্বা? এইডা অইলো আইরে খোকা পাখি, পোলারে খুঁজে। কেন খুঁজে? নৌ ডাকাতেরা গ্রামে আইসা একবার জোর কইরা একজনের পোলারে তুইল্লা লইয়া গেছিল। পোলারে খুঁজতে গিয়া ঐ বাপ মইরা যায়। মৃত্যুর পরে নাকি হেই বাপ পাখি অইয়া জন্মাইছে। পোলাডারে এহনও খুঁজে। আর কয়, পুত পুত পুত...\" ও চুপটি করে বসে থাকে। শরীর ভেঙে পড়েছে ওর। বন্য ফল, আধা কাঁচা সবজি, নদীর জলে কি আর চলে! তবুও অভিযোগ নেই ওর। আছে আপোষ, দেশকে স্বাধীন করার শক্তি। চর ধলেশ্বরী স্বাধীন হলেই স্বাধীন হবে বাংলাদেশ। ও স্বপ্ন দেখে তাই। শরীরের ভাঙন মেনে নেয়া যায়, স্বাধীনতার ভাঙন যায় না। এর আগেও চর ধলেশ্বরীতে হামলা চালিয়েছিল বান্ডারি চেয়ারম্যান। উর্বর পলিমাটি, মাছের আখরা দেখে কিছুতেই তর সইছিল না তার। রাজাকার বাহিনীকে নিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারি দিয়ে সেদিনের হামলা ছিল তারই কাজ। চরের ফল, মাছ, গরুর দুধ সবকিছু পাঠিয়ে দেয় পাকিস্তানি ক্যাম্পে। কিন্তু মানুষ! পাকিস্তানিরা কি মানুষও খায়! মানুষ হয়ে মানুষকে কি খাওয়া যায়! পোকা বুঝে না সেকথা। কিন্তু বাবা বুঝে।

হঠাৎই রেডিও\'র শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায় পোকার। খুশিতে আপ্লুত হয়ে বাবাকে বলে, আব্বা, এইযে হোনো। দেশের এক মুড়া স্বাধীন অইয়্যা গেছে। বাবা খুশি হয়ে পোকাকে জড়িয়ে ধরে আবারও বলে উঠে, আর দুইডা দিন কষ্ট কর পোকা। হেরপর স্বাধীন দেশে বাপ পোলা মিল্লা পেট ভইরা খামু। পোকা ঘুমিয়ে পরতেই বাবা পুতুলগুলোকে তুলে রাখে পঙ্কিল প্রান্তরের মোড় থেকে। পোকা পুতুলগুলোকে ভাবে ওর এলেবেলে খেলার সিপাহি আর ও, ধলেশ্বরী চরের রাজা, শীতলক্ষ্যার রাজা। যতদূর দৃষ্টি যায় সবকিছুই ওর। ওর করুণ শরীরে জুনিপোকারা খেলে। চপলমতি এক জুনিপোকা ওকে বলে, “দেশটা স্বাধীন হইলে আমাগো হগল আলো তোমারে দিয়া দিমু পোকা ভাই। হেই আলো দিয়া তুমি সুন্দর একটা জামা কিনবা।” পোকা কাঁদে। নদীর তীরে ঘাসের উপর শুয়ে ওর মনে হয়, কি সুন্দর পৃথিবী, কি সুন্দর আকাশ, কি সুন্দর জীবন, কি সুন্দর স্বাধীনতা!
রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানিরা যেদিন চরে আক্রমণ করে, সেদিন গ্রামে ছিল মেলা। পুতুল নাচের সব পুতুলগুলোকে পাকিস্তানিরা যখন নদীতে ফেলে দেয়, সেগুলো আটকা পড়ে কচুরিপানার ঝোপে। আর ওরা তুলে রেখে দেয় নৌকায়। এতে অবশ্য একটা ফায়দা হয়েছে ওদের। রাতে যখনই ওরা পাকিস্তানিদের ঘাঁটিতে অভিযান চালানো শুরু করতো, তখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুতুল বসিয়ে রাখতো। এতে করে পাকিস্তানি আর্মিরা ভুল জায়গায় গুলি ছুড়তো আর ভাবতো এখনো বুঝি অনেক মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছে গ্রামে। এভাবেই ভয়ে ভয়ে অনেক রাজাকার পালিয়ে বেঁচেছে চর ছেড়ে।
বাবা ওকে বলে, “হোন পোকা। ফজরের আগেই পশ্চিম ঘাঁটিতে আক্রমণ চালামু।” আক্রমণের কথা শুনে ও খুব খুশি হয়। কারণ দেশটা স্বাধীন হলে ও পেট ভরে খেতে পারবে, দেশের মানুষও খাবে পেট ভরে। অবশ্য আক্রমণ করার আগে ওকে অনেক বেশি কাজ করতে হয়। গভীর রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে ও চলে আসে সদর ঘেঁষা পশ্চিম ঘাঁটিতে। দূর থেকে দেখে, লোহার টুপি মাথায় দিয়ে পাহারা দিচ্ছে সেপাইয়ের দল। ও বলে কেয়াপাতার সেপাই। দূরে দূরে সাদা পুতুলগুলো সাজিয়ে রেখে চলে আসে ও। কিন্তু ফিরতে খুব কষ্ট হয়। অন্ধকারে কাঁদায় পা দিতেই শামুকে কেটে যায় পা। ও নীল প্লাস্টিক দিয়ে বেঁধে রাখে পা\'টা। গতরাতে বৃষ্টি হয়েছে খুব। অবশ্য এখন বৃষ্টি নেই। নৌকা থেকে নেমে বাবা যখন বন্দুক নিয়ে মিলিটারি ঘাঁটিতে আক্রমণ করে, তখন ও গাছের উপর উঠে বল্লম ছুঁড়ে মারে। এর আগে রাজাকার পিচ্চি সহ বিশজন পাকিস্তানি মিলিটারি প্রাণ হারিয়েছে ওর বল্লমের আঘাতে। সেবার সময়মত বল্লম ছুঁড়ে না মারলে তো ধরাই পড়ে যেতো বাবা। আর মাত্র একটা ঘাঁটি। তারপর একটা দেশ, একটা জাতি, একটা লালিত স্বপ্ন, একটা স্বাধীনতা। কাঁধে দশটা বল্লম আর মাথায় লোহার টুপি দিয়ে সন্তর্পণে গাছে উঠে পড়ে পোকা। মিলিটারিরা টের পায় না। একশো কেয়াপাতার সেপাই আর বান্ডারি চেয়ারম্যান সহ বারো জন রাজাকারের বেশি মানুষ হবে না ঘাঁটিতে। ছেঁড়া লুঙ্গিটায় শক্ত করে কাছার বেঁধে বের হয় বাবা। পিস্তল একটা হাতে, আরেকটা কাঁধে।

গাছের উপর থেকে সূচালো বল্লমটা ছুড়ে মারতেই বিঁধে যায় পাহারারত সৈনিকের বুকে। ঝোপের আড়াল থেকে তাক করে গুলি ছুড়তে শুরু করে দেয় বাবা। দশজন সৈনিক বেহুঁশ। মরে গেছে একেবারে। অবিশ্রান্তভাবে পাকিস্তানি মিলিটারিরা গুলি চালাতে থাকে সাদা রঙের পুতুলগুলোর দিকে। ঝোপের আড়াল থেকে গুলি চালাতে থাকে বাবাও। ওর ছয়টা বল্লমে ছয়জন শেষ। এর মধ্যে দুইজন রাজাকার। একেবারে চিঁড়ে গেছে বান্ডারি চেয়ারম্যানের লালচে কলিজাটা। এদিকে গুলি করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে বাবা। ওর কাছে এখন একটা বল্লমই আছে। উপর থেকে নিশানা করতে গিয়ে পিছলা গাছের ওরসা মগডাল থেকে নিচে পড়ে যায় ও। ভেঙে যায় বা হাতটা। কিন্তু কাদায় শুয়ে ও ডান হাত দিয়ে বল্লমটা খুব জোরে ছুড়ে মারে। একেবারে বিঁধে যায় লোহার টুপিওয়ালা সৈনিকটার বুকে। কিন্তু সৈনিকের পিস্তলের গুলিও এসে আঘাত করে ওর অকুটিল হৃদয়টাতে। এদিকে বাবার কাছে চিরদিনের জন্য কুপোকাত হয়ে পড়ে রাজাকারসহ পাকিস্তানি মিলিটারির দল। সব মরে একেবারে নিষ্প্রভ ভূত।

ও চেয়ে থাকে অপলক। বাবা জোরে জোরে বলে উঠে, জয় বাংলা, বাংলার জয়। জোর গলায় ও নিজেও বলতে চেষ্টা করে, জয় বাংলা, বাংলার জয়। ওর শব্দ বাবার কানে পৌঁছায় না। বাবা ওকে খুঁজতে খুঁজতে বলতে থাকে, পোকারে, কইছিলাম না স্বাধীন দেশে বাপ পোলা মিল্লা পেট ভইরা খামু.. তুই কই গেলি পোকা?... কিন্তু বাবা খুঁজে পায় না ওকে। উপর থেকে পড়ে হাত পা ভেঙে যাওয়ায় উঠে দাঁড়াতে পারে না পোকা। কাটা পায়ের রক্তে আরও রক্তিম হয়ে উঠেছে ওর কাছার দেওয়া লাল লুঙ্গিটা। পূর্ব দিগন্তের মেঘগুলো মিলিয়ে পড়ছে কাঁদতে কাঁদতে, দিগন্তে স্বাধীনতার আলোক সমারোহ ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। স্বাধীনতার মোলায়েম আলো গায়ে লাগতেই ও বলে উঠে, এইডা অইলো এলা, পাকিস্তানি গো লগে খেলছি আমি খেলা। বিরান আকাশের মেঘ চিঁড়ে হাসিমুখে উড়ে যেতে থাকে ওর তন্ময় প্রাণবায়ু। জুনিপোকার দল সর্বশক্তি দিয়ে আটকে ধরে ওকে আর তেজোদৃপ্ত কণ্ঠে বলে, দেশের জন্য জীবন দিয়া লাল করলো যে নিজের জামা, শহিদ পোকার মৃত্যু নাই, পোকার নামেই স্বাধীনতানামা।