অনন্ত প্রতীক্ষা
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে সবেমাত্র বিছানায় শুয়ে চোখটা একটু বুজেছি, এমন সময় আচমকা ফোনের রিংটোন শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। আননোন নাম্বার।
ফোনটা রিসিভ করে বললাম, “হ্যালো, কে বলছেন?”
অপর পাশ থেকে উত্তর এলো, “হ্যালো, আরিফ ভাই, আমি আলিফ। এটা ফরিদা ফুফুর নাম্বার। আমার মোবাইলে চার্জ নেই। সুইচ অফ হয়ে গেছে। তাই ফুফুর মোবাইল থেকে ফোন দিলাম।”
আমি বললাম, “আচ্ছা, সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু এই ভরদুপুরে ফোন দিয়ে আমার কাঁচা ঘুমটা নষ্ট করার কারণটা কি জানতে পারি?”
“ভাইজান, সর্বনাশ হয়ে গেছে! আম্মা হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। এখন আম্মা হাসপাতালে, তবে এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ফুফু বললেন, আম্মা নাকি বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। হাঁচি-কাশি আর হালকা জ্বরের সাথে প্রচুর শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। আমরা দুশ্চিন্তা করব বলে আম্মা আমাদের এত দিন কিছু জানতে দেননি। গতকাল গ্রামে এসে আম্মার মুখ দেখেই বুঝেছিলাম আম্মা গুরুতর অসুস্থ। আজ ভোরে বিছানা থেকে উঠতেই হঠাৎ করে মাটিতে পড়ে যান।”
আমি আঁতকে উঠলাম। আমার খুবই সুস্থ-সবল একজন মানুষ। তাঁকে দেখলে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে র তাঁর বয়স ৭০ এর বেশি।
আমি আলিফকে বললাম, “তুই চিন্তা করিস না। আমি এখনই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেবো। দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে। আম্মা শিগগিরই সুস্থ হয়ে যাবেন।”
ছোট ভাইকে সান্ত্বনা দিতে কথাগুলো বললাম ঠিকই, কিন্তু মনের মধ্যে কেন জানি না এক অজানা আতঙ্ক জেঁকে বসল।
আমি বাড়ির সবাইকে দ্রুত তৈরি হয়ে নিতে বললাম। তারপর ঘরে এসে প্রয়োজনীয় মালপত্র আর জামা-কাপড় গোছাতে শুরু করলাম।
আমার স্ত্রী শাহিদা এসে বলল, “তুমি রেডি হও। আমি এসব দেখছি।”
সব গোছগাছ শাহিদার ভরসায় রেখে আমি জামা-কাপড় পরতে চললাম। দুপুর দুইটা বাজার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রওনা দিয়ে দিলাম। গন্তব্য কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ।
আমি আরিফ ইসলাম, সরকারি চাকরিজীবী। আমার স্ত্রী শাহিদা আক্তারও সরকারি চাকরি করে। বড় ছেলে ইরফান ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে আর ছোট মেয়ে আফরা ক্লাস টেনে পড়ে। আমার জন্ম ১৯৬৯ সালে। ছোট ভাই আলিফের জন্ম ১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। আলিফ ঢাকা শহরের বিখ্যাত উকিল। তার দুই ছেলে। আমাদের বাবা আতাহার ইসলাম ১৯৭১ সালে যুদ্ধে অংশ নিতে বাড়ি ছেড়েছিলেন, আর ফেরেননি। ছোট থেকে আম্মাই আমাদের বড় করেছেন।
আজ ১৩ই ডিসেম্বর, বুধবার। পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য আমি আর শাহিদা ছুটি নিয়েছিলাম। আগামী তিন দিন তো এমনিতেই সরকারি ছুটি। গাড়ি চলতে শুরু করার পর আমরা সবাই বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলাম। এমন সময় আফরা হঠাৎ বলে উঠল,
“বাবা, কাল তো শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একটা আর্ট কম্পিটিশন হওয়ার কথা। আমি তো তাহলে পার্টিসিপেটই করতে পারব না।”
আমি বললাম, “একটা আর্ট কম্পিটিশনে অংশ না নিতে পারলে কী এমন হবে? কম্পিটিশনটা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যটা যদি তুই বুঝতে পারিস সেটাই অনেক।”
“একদম ঠিক বলেছ।” আমার কথায় সায় দিলো শাহিদা। বলল, “১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার আব্বাকেও তারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। অমানবিক অত্যাচার করেছিল তাঁর ওপর। শেষ পর্যন্ত তারা আব্বাকে মেরে ফেলে। এরপর থেকে সরকারের দেওয়া ভাতা আর আব্বার রেখে যাওয়া সামান্য সম্পত্তি দিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে আম্মা অনেক কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন। আম্মা সবসময় চাইতেন আমি যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, একটা ভালো চাকরি করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি তাঁর কষ্টের ফসল দেখে যেতে পারেননি। আমি কলেজে থাকতেই আম্মা মারা যান।”
শাহিদার চোখ ছলছল করে উঠল। ইরফান আর আফরা দুপাশ থেকে ওকে জড়িয়ে ধরল। লক্ষ করলাম শাহিদার চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
এরপর আর গাড়িতে তেমন কথা হলো না। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম থাকায় রাত আটটার সময় বাড়িতে পৌঁছলাম। বাড়িতে ঢুকতেই দেখতে পেলাম ছোট চাচা ইকরাম ইসলামকে। চাচাকে সালাম দিয়ে আম্মার কথা জিজ্ঞেস করলাম। চাচা জানালেন আম্মার অবস্থা খুব একটা ভালো না। আমি আর বিশ্রাম নিতে পারলাম না। গাড়ি নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আলিফকে ফোন করে হাসপাতালের সামনে দাঁড়াতে বললাম।
হাসপাতালে সামনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই আলিফ ছুটে এলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে বললাম, “আলিফ, আম্মার কী খবর? এখন কেমন আছেন?”
আলিফ কিছু একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। দৌড়ে হাসপাতালের ভেতরে চলে আসলাম।
রিসিপশনে একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোককে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “বেগম সুফিয়া খাতুন কোন ওয়ার্ডে আছেন?”
ততক্ষণে আলিফ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই আলিফ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “চলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। ভাইজান, আম্মার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। ডাক্তার সাহেব বলেছেন,” আরিফের গলা ভারী হয়ে গেছে। কথাটা বলতে গিয়ে আটকে গেল। বুঝতে পারলাম কোনো খারাপ সংবাদ আছে। নিজের মনকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলাম। এরপর আলিফের দুই হাত চেপে ধরলাম। প্রশ্ন করলাম, “ডাক্তার সাহেব কী বলেছেন?”
আলিফ কোনোমতে বলল, “আম্মার খুব বিরল একটা রোগ ধরা পড়েছে। বিদেশেও এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তিনি আর তিন দিনের বেশি বাঁচবেন না।”
আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। আমার মাথা কাজ করছে না। এই কয়েক মাস আগে যখন বাড়িতে এসেছিলাম, কী হাসিখুশিই না ছিলেন আম্মা! হঠাৎ করে কীভাবে একটা মানুষের শরীরের এত অবনতি হতে পারে?
আলিফ আর কান্না চেপে রাখতে পারল না। আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল সে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। আমার চোখ দুটোও ঝাপসা হয়ে এলো। ভেবে পেলাম না এখন আমাদের কী করণীয়।
দুজনে আম্মার ওয়ার্ডের সামনের একটা সিটে এসে বসলাম। এমন সময় একজন ডাক্তার এসে বললেন, “আলিফ সাহেব একটু শুনবেন?”
আলিফ উঠে গিয়ে তাঁর সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল। ডাক্তার সাহেব চলে গেলে ও আমার পাশে এসে বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী বললেন ডাক্তার সাহেব?”
আলিফ বলল, “ডাক্তার সাহেব বললেন আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে। এই দুর্দিনে আশা হারিয়ে ফেললে তার পরিণতি খুব ভয়ানক হতে পারে। আম্মা জানেন যে তিনি আর হয়তো তিনদিনের বেশি বাঁচবেন না। কিন্তু আম্মা যদি এখন বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলেন তাহলে হয়তো তাঁকে সর্বোচ্চ আর একদিন বাঁচানো সম্ভব হবে। বেঁচে থাকার ইচ্ছাই এখন আম্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। আর আমরা যদি এখন ভেঙে পড়ি, তাহলে আম্মার বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই তো মরে যাবে। আমাদের এখন শক্ত থাকতে হবে ভাইয়া। আম্মাকে কোনোমতেই আশা হারাতে দেওয়া যাবে না।”
আমি সব শুনে বললাম, “ডাক্তার সাহেব ভুল কিছু বলেননি। শোন, আমরা এখন থেকে আম্মার সামনে খুব হাসিখুশি থাকব। আম্মাকে কোনো দুশ্চিন্তা করতে দেবো না। ঠিক আছে?”
আলিফ আমার কথায় সম্মতি জানাল। এরপর আমরা দুজনে আম্মার সাথে দেখা করতে গেলাম। আম্মা আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন।
বললেন, “আরিফ, বাবা আমার! এতদিন কোথায় ছিলি? এই বুড়িটাকে তো ভুলেই গেছিস।”
আমি আম্মার পা ছুঁয়ে সালাম করে বললাম, “আম্মা, এসব কী বলছেন বলুন তো! সন্তান কীভাবে নিজের মাকে ভুলতে পারে?”
আম্মা বললেন, “সে তো বটেই। আচ্ছা, আমার নাতি-নাতনিরা কেমন আছে? কতদিন দেখি না ওদের। ওরা এসেছে তো তোর সঙ্গে? আর বড় বৌমা কেমন আছে?”
“ওরা সবাই ভালো আছে। কিন্তু ওরা খুব ক্লান্ত, তাই ওদের বাড়িতে রেখে এসেছি। কাল ভোরে ওদের নিয়ে আসব না হয়,” বললাম আমি।
বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ আম্মার সাথে গল্প করলাম। আলিফ এর স্ত্রী সন্তানদের খবরও নেয়া হলো। কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিয়েছিলাম ডাক্তারের করা সে ভয়ানক ভবিষ্যদ্বাণীর কথা। শুধু আমি নই, আম্মা আর আলিফও যেন মনের অজান্তেই ভুলে গেছে সেই কথা। সত্যিই তো! এত হাসি-খুশি, প্রাণ চঞ্চল একটা মানুষ কীভাবে এত কম দিন বাঁচতে পারে এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু ঐ দুঃসংবাদটার কথা মনে পড়তেই শিউরে উঠলাম। খুবই বিচলিত হয়ে পড়লাম আমি।
আম্মা সেটা বুঝতে পেরে বললেন, “বাবা রে, তোরা আমার সন্তান, আমার গর্ব। জানি, আমি আর বেশি দিন বাঁচব না। কিন্তু সেই নিয়ে যদি তোরা দুশ্চিন্তা করিস, আমি যে তাহলে শান্তিতে মরতে পারব না। আর ডাক্তার সাহেব আমায় বলেছেন মনের ভেতর আশা ধরে রাখতে। এখন তোরাই যদি ভেঙে পড়িস, আমি কীভাবে বাঁচব বল তো?”
আমি বললাম, “আম্মা, দয়া করে এমন কথা বলবেন না।”
আম্মা বললেন, “আচ্ছা, বেশ। বলব না। কিন্তু তোরা আমাকে একটা কথা দিবি?”
আমি আর আলিফ জিজ্ঞেস করলাম, “কী কথা আম্মা?”
আম্মা জবাবে বললেন, “১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন মুজিব ভাই তাঁর সেই রক্ত গরম করা ভাষণ দেন তখন তোদের আব্বা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে সময় আলিফ আমার পেটে। তোদের আব্বা যাওয়ার আগে আমায় বলেছিলেন, ‘‘সুফিয়া চিন্তা করো না। আমার কিচ্ছু হবে না। ইনশাআল্লাহ, একদিন এই দেশকে স্বাধীন করে ঘরে ফিরব।’’ তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে তিনি অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসবেন। আমিও কথা দিয়েছিলাম তার জন্য আমি অপেক্ষা করব। তারপর নয় মাস কেটে গেল। যুদ্ধ শেষ হলো। স্বাধীন দেশে আলিফ জন্ম নিল। কিন্তু তোদের আব্বা আর এলেন না। অনেকে বলেছিল তিনি শহিদ হয়েছেন। তাহলে তো তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার কথা। কিন্তু না, সেটা পাওয়া যায়নি। আমি জানি, তোদের আব্বা বেঁচে আছেন। দেখিস তোরা, একদিন তিনি ঠিক ফিরে আসবেন। বাবারা, আমাকে কথা দে। আমি যদি মরে যাই তাহলে তোদের আব্বা যখন ফিরে আসবেন তখন তোরা তাঁকে বলবি যে তোদের আম্মা তার কথা রেখেছিল। মরার আগ পর্যন্ত সে তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছিল।
আম্মা কাঁদতে লাগলেন। আলিফের চোখ দুটোও ছলছল করছে। ছোটবেলা থেকে আম্মা আমাদের অনেক গর্ব করে বলতেন, ‘‘এদেশ স্বাধীন হয়েছে তোদের আব্বার জন্য। উনি ফিরে এলে তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করবি।’’ আমরা সবসময় ভাবতাম আব্বা হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবেন। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু আব্বা আর ফেরেননি। তখন মনে হতো, হয়তো অন্যদের কথাই ঠিক, আব্বা শহিদ হয়েছেন। তবে আম্মা কখনোই সে-কথা বিশ্বাস করতেন না। তাই আমরা দুই মা-ভক্ত ছেলেও নিজেদের মায়ের কথাকেই বেদবাক্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম আব্বা একদিন ফিরবেন। কিন্তু আমাদের এই কল্পনা কল্পনাই রয়ে গেল। আব্বা এলেন না।
আমি আম্মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। আলিফও আমাদের জড়িয়ে ধরল। রাতটা হাসপাতালেই কাটালাম। পরদিন ভোরবেলা উঠে ফজরের নামাজ পড়ে গাড়ি নিয়ে আমি আর আলিফ বাড়ি ফিরলাম। দুঃসংবাদটা শোনার পর কেউই বিশ্বাস করতে চাইছিল না। কিন্তু নিয়তির কাছে সবাই অসহায়। সবাইকে মানসিকভাবে শক্ত হতে বললাম। যদিও জানি না আমি নিজে কতটা শক্ত থাকতে পারব। সকাল সাতটা বাজার আগেই সবাইকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলাম। টের পেলাম, কারোর মনের অবস্থাই ভালো না। ভালো না থাকাটাই অবশ্য স্বাভাবিক। আমার মাথায় শুধু একটা বিষয় ঘুরছে, আজকের পর আর মাত্র দুটো দিন। এরপরই ভাগ্যের নির্মম লিখনকে মেনে নিতে হবে আমাদের। আর কিচ্ছু করার থাকবে না।
ইরফান, আফরা আর আলিফের দুই ছেলে লাবিব আর তামিম একসাথে আম্মার ওয়ার্ডে গেল তাঁর সাথে দেখা করতে। লাবিব ইরফানের সমবয়সী আর তামিম পড়ে ক্লাস এইটে। আমি আর আলিফ দরজার সামনে পায়চারি করছি। শাহিদা আর তার ছোট জা ফাহমিদা সামনের সিটটাতে বসে আছে। আজ শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শাহিদার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। সকাল থেকেই খেয়াল করছিলাম শাহিদা বেশ খানিকটা অন্যমনস্ক। আমরা যখন আম্মার ব্যাপারে ঐ দুঃসংবাদটা দিলাম তখন থেকে ও প্রচণ্ড মুষড়ে পড়েছে।
শাহিদার বাবা মানে আমার শ্বশুরমশাই ঢাকা শহরের বিখ্যাত সাংবাদিক ছিলেন। শুনেছি ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানিরা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর তারা একটা খুঁটিতে বেঁধে তাঁকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে বলে। তিনি রাজি না হওয়ায় পাকিস্তানিরা তাঁর উপর নৃশংস অত্যাচার চালায়। তারপরও ওরা যখন তাঁকে দিয়ে ঐ কথা বলাতে ব্যর্থ হয় তখন তারা শাহিদার বাবাকে গুলি করে হত্যা করে। ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় তার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। শাহিদা পরের বছর জানুয়ারি মাসে জন্ম নিয়েছিল। পরম আদরে তাকে বড় করেছিলেন তার মা। কিন্তু শাহিদা কলেজে থাকাকালীন তিনি মারা যান। তাই বিয়ের পর আমার মাকে পেয়ে শাহিদা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গিয়েছিল। নিজের মায়ের মতো ভালবাসতে শুরু করে আম্মাকে। তাদের সম্পর্কটা শাশুড়ি-বৌমা থেকে দ্রুত মা-মেয়ের সম্পর্কে পরিণত হয়।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে যখন পায়চারি করছি এমন সময় ওয়ার্ডের ভেতর থেকে আফরার গলা শুনতে পেলাম, “দাদু শোনো, আমি বলছি, তোমার কিচ্ছু হবে না। ডাক্তার আঙ্কেল এমনিই ওসব কথা বলেছেন।”
আম্মা মুচকি হেসে বললেন, “জানি তো সোনা। আমাকে তো বেঁচে থাকতেই হবে। নাহলে তোরা কাকে দাদু বলে ডাকবি বল তো?”
“হ্যাঁ, সেটাই তো। আর তুমি না থাকলে আমাদের ভূতের গল্পই বা কে শোনাবে?” বলল তামিম।
বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ তাদের কথোপকথন চলল। বাচ্চারা বের হওয়ার পর আমরা বড়রা চারজন ভেতরে ঢুকলাম। আম্মাকে আমরা পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। আম্মা কে কেমন আছে, সেই খোঁজখবর নিলেন। এরপর বললেন, “বড় বৌমা, আজ তো ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ। তোমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। বাড়িতে যাবে না?”
“না, মা,” জবাব দিলো শাহিদা। বলল, “ঐ বাড়িতে তো আমার মা-বাবা কেউই নেই। এখানে তো অন্তত মা বলে ডাকার একজন আছে।”
“তা তো বটেই,” আম্মা বললেন। “তবে বৌমা, তোমার আব্বা কিন্তু তোমার গর্ব। এই দেশকে তিনি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। তা না হলে কী করে একটা মানুষ শত অত্যাচারের মুখেও পাকিস্তানিদের জয়গান করা থেকে বিরত থাকে? নিজের জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি নিজের মাতৃভূমির প্রতি অনুগত ছিলেন। এমন দেশপ্রেমী এদেশে কতজনই বা আছে?”
শাহিদার মুখ দেখে বুঝলাম এক মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে তার মনের ভেতর। গর্ব ও শ্রদ্ধার সাথে খানিকটা কষ্ট আর অভিমানের মিশেলে তৈরি বিচিত্র এক অনুভূতি!
বাকিটা দিন এত দ্রুত কীভাবে কেটে গেল বলতে পারব না। তবে প্রতিনিয়ত মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর মাত্র দুই দিন! রাত আটটার দিকে আম্মাকে ওয়ার্ড থেকে হাসপাতালের ক্যান্টিনে নিয়ে এলাম। অল্প সময়ের মধ্যে বাচ্চাদের নিয়ে ফরিদা ফুফুও চলে এলেন। ততক্ষণে ইকরাম চাচাও হাসপাতালে চলে এসেছেন। এতদিন পর সবাই এক টেবিলে বসে খেতে খুব ভালো লাগল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অনেকক্ষণ ধরে আমরা গল্পগুজব করলাম। দেখতে দেখতে আরও একটা দিন চলে গেল।
ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ, শুক্রবার। দুপুরে আমরা ছেলেরা একসাথে মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষে আম্মার জন্য অনেকক্ষণ দোয়া করলাম। হাসপাতালে ফিরে জানতে পারলাম আম্মার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা নাড়াতে পারছেন না। হতবাক হয়ে গেলাম আমি। আম্মার ওয়ার্ডে ঢুকে দেখলাম আম্মা শুয়ে আছেন।
আম্মা আমাকে দেখেই বললেন, “আরিফ বাবা, আমি তো আর বেশি দিন বাঁচব না। তবে বিশ্বাস কর, আমার কোনো আক্ষেপ নেই। তোদের দুজনকে আমি মানুষ করতে পেরেছি, এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে! কিন্তু তোর আব্বাকে যদি এই মৃত্যুশয্যায় শেষবারের মতো দেখে যেতে পারতাম তাহলে হয়তো মনে শান্তি নিয়ে মরতে পারতাম। তবে ডাক্তারবাবুর কথামতো আমি যদি কাল মারা যাই, তাহলে নিজের মনে অন্তত একটা সান্ত্বনা পাব যে, আমি বিজয় দিবসে মরেছি; এদেশের বিজয়ের দিন মরেছি; তোর আব্বার বিজয়ের দিন আমি মরেছি। আমার আর কীসের আফসোস?”
আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। আম্মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। সেদিন অনেক মুরব্বি, হুজুররা হাসপাতালে এসে পবিত্র কোরআন শরীফ পড়ে আম্মার জন্য দোয়া করলেন। গ্রামের অনেকে এসে আম্মার সাথে দেখা করে গেলেন। মনে মনে ভাবছি, তবে কি সত্যিই আম্মা আর একদিন বাঁচবেন?
সেদিন রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারলাম না। সারারাত নামাজ আর দোয়া-দরুদ পড়ে কান্নাকাটি করলাম। শেষ রাতে যখন চোখটা হালকা একটু লেগে এসেছিল এমন সময় ফজরের আজান কানে এলো। সাথে সাথে উঠে বসলাম আমি। তড়িঘড়ি করে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি আম্মা উদাস চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন।
তাঁকে সালাম করে জিজ্ঞেস করলাম, “আম্মা শরীরটা কেমন লাগছে?”
আম্মা উত্তর দিলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো লাগছে বাবা।”
“হাত-পা নাড়াতে পারছেন এখন?” প্রশ্ন করলাম আমি।
“নাহ, হাতে-পায়ে গতকাল থেকে যে কী হলো, পুরো অবশ হয়ে গেছে,” আম্মা বললেন।
আমি বললাম, “আপনি একদম চিন্তা করবেন না। ডাক্তার সাহেব আপনাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলবেন।”
আম্মা মৃদু হেসে বললেন, “মরেই তো যাব। এখন আর আমার হাত-পা নাড়িয়ে কাজ কী?”
আম্মার হাসিমুখটা দেখে হঠাৎ এক অজানা বিয়োগ-ব্যথায় আমার অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। মনে হলো আম্মাকে কি আজকের পর আর কখনো হাসতে দেখব?
আমি সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। ফজরের নামাজ পড়ে সবাই মিলে আমাকে দেখতে গেলাম। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই এসেছেন তাঁকে দেখতে। আম্মা খুব শান্তভাবে কথা বলছেন। কিন্তু তাঁর চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা লক্ষ করলাম।
এমন সময় একটা মহিলা কণ্ঠ হঠাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠল, “ভাবি তো আতাহার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদটা আজ পর্যন্ত বিশ্বাস করলেন না।”
কণ্ঠটা অনুসরণ করে ভিড়ের মাঝে তাকাতেই চোখ পড়ল জেবা চাচির উপর। তিনি ইকরাম চাচার স্ত্রী।
আম্মা উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আরিফের আব্বা মরেন নাই! তার মৃত্যুর কী প্রমাণ আছে?”
বেশ কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা। তারপর আবার মানুষের গুঞ্জনে পুরো ওয়ার্ডটা ভরে উঠল।
আম্মা একটা সময় বললেন, “আরিফের আব্বা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। নিজের দেশের জন্য তিনি সব করতে রাজি ছিলেন। তিনিই আমাকে এই দেশ, এদেশের মানুষকে নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছেন, তাদের ভালবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি সবসময় বলতেন, “আমার সন্তানরা একদিন এই দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে।” আমি তাকে নিয়ে সবসময় গর্ব করতাম, আজও করি।”
জেবা চাচির মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হলো না। কিছুক্ষণ পর আমরা প্রায় সবাই যখন সকালের নাশতা করতে বাইরে এসেছি তখন হঠাৎ আম্মার চিৎকার শুনে দৌড়ে ভেতরে আসলাম। বিছানার কাছে এসে নিচু হয়ে দেখতে পেলাম আম্মার চোখ দুটো বিস্ফারিত। মুখটা খানিকটা খোলা। একটা হাত বুকের ওপর।
আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে গেছে। গলা থেকে একটা আওয়াজও বের হচ্ছে না। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। ইয়া আল্লাহ! নিয়তির কাছে এভাবে হেরে গেলাম আমরা! এই সমগ্র বিশ্বে আম্মাই একমাত্র মানুষ ছিলেন যাঁকে সারা জীবন নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেছি, নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছি। কিন্তু এর বিনিময়ে কখনো ঠকতে হয়নি। ছোট থেকে সবসময় আম্মা আলিফ আর আমাকে আমাদের বাবার আদর্শ মেনে চলতে বলতেন। আমি সরকারি চাকরিটা পাওয়ার পর আম্মা খুব খুশি হয়েছিলেন। আম্মা সবসময় চাইতেন আমরা দুই ভাই যেন সারাজীবন দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করি।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠল ‘ইন্নালিল্লাহ’ ধ্বনিতে। কান্নার রোল পড়ে গেল চারদিকে। আমার চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ছে। ঐ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে আমি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এলাম।
কখনো ভাবিনি, যে মানুষটা আমাদের জন্য এত কিছু করল সেই মানুষটাই একদিন এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। আম্মা আব্বাকে অনেক ভালবাসতেন, নিজের থেকেও বেশি। তাই সম্ভবত আল্লাহ তাঁর মৃত্যুটা এই দিনেই লিখেছিলেন। কিন্তু আব্বা? তিনি আজও কেন ফিরলেন না? জানি না। কোনোদিন ফিরবেন কিনা তাও জানি না। হয়তো আম্মার কথা অনুযায়ী একদিন তিনি ফিরবেন।
অনন্ত প্রতীক্ষা
মাতৃকা আরজমীর
ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে সবেমাত্র বিছানায় শুয়ে চোখটা একটু বুজেছি, এমন সময় আচমকা ফোনের রিংটোন শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। আননোন নাম্বার।
ফোনটা রিসিভ করে বললাম, “হ্যালো, কে বলছেন?”
অপর পাশ থেকে উত্তর এলো, “হ্যালো, আরিফ ভাই, আমি আলিফ। এটা ফরিদা ফুফুর নাম্বার। আমার মোবাইলে চার্জ নেই। সুইচ অফ হয়ে গেছে। তাই ফুফুর মোবাইল থেকে ফোন দিলাম।”
আমি বললাম, “আচ্ছা, সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু এই ভরদুপুরে ফোন দিয়ে আমার কাঁচা ঘুমটা নষ্ট করার কারণটা কি জানতে পারি?”
“ভাইজান, সর্বনাশ হয়ে গেছে! আম্মা হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। এখন আম্মা হাসপাতালে, তবে এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ফুফু বললেন, আম্মা নাকি বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। হাঁচি-কাশি আর হালকা জ্বরের সাথে প্রচুর শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। আমরা দুশ্চিন্তা করব বলে আম্মা আমাদের এত দিন কিছু জানতে দেননি। গতকাল গ্রামে এসে আম্মার মুখ দেখেই বুঝেছিলাম আম্মা গুরুতর অসুস্থ। আজ ভোরে বিছানা থেকে উঠতেই হঠাৎ করে মাটিতে পড়ে যান।”
আমি আঁতকে উঠলাম। আমার খুবই সুস্থ-সবল একজন মানুষ। তাঁকে দেখলে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে র তাঁর বয়স ৭০ এর বেশি।
আমি আলিফকে বললাম, “তুই চিন্তা করিস না। আমি এখনই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেবো। দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে। আম্মা শিগগিরই সুস্থ হয়ে যাবেন।”
ছোট ভাইকে সান্ত্বনা দিতে কথাগুলো বললাম ঠিকই, কিন্তু মনের মধ্যে কেন জানি না এক অজানা আতঙ্ক জেঁকে বসল।
আমি বাড়ির সবাইকে দ্রুত তৈরি হয়ে নিতে বললাম। তারপর ঘরে এসে প্রয়োজনীয় মালপত্র আর জামা-কাপড় গোছাতে শুরু করলাম।
আমার স্ত্রী শাহিদা এসে বলল, “তুমি রেডি হও। আমি এসব দেখছি।”
সব গোছগাছ শাহিদার ভরসায় রেখে আমি জামা-কাপড় পরতে চললাম। দুপুর দুইটা বাজার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রওনা দিয়ে দিলাম। গন্তব্য কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ।
আমি আরিফ ইসলাম, সরকারি চাকরিজীবী। আমার স্ত্রী শাহিদা আক্তারও সরকারি চাকরি করে। বড় ছেলে ইরফান ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে আর ছোট মেয়ে আফরা ক্লাস টেনে পড়ে। আমার জন্ম ১৯৬৯ সালে। ছোট ভাই আলিফের জন্ম ১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। আলিফ ঢাকা শহরের বিখ্যাত উকিল। তার দুই ছেলে। আমাদের বাবা আতাহার ইসলাম ১৯৭১ সালে যুদ্ধে অংশ নিতে বাড়ি ছেড়েছিলেন, আর ফেরেননি। ছোট থেকে আম্মাই আমাদের বড় করেছেন।
আজ ১৩ই ডিসেম্বর, বুধবার। পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য আমি আর শাহিদা ছুটি নিয়েছিলাম। আগামী তিন দিন তো এমনিতেই সরকারি ছুটি। গাড়ি চলতে শুরু করার পর আমরা সবাই বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলাম। এমন সময় আফরা হঠাৎ বলে উঠল,
“বাবা, কাল তো শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একটা আর্ট কম্পিটিশন হওয়ার কথা। আমি তো তাহলে পার্টিসিপেটই করতে পারব না।”
আমি বললাম, “একটা আর্ট কম্পিটিশনে অংশ না নিতে পারলে কী এমন হবে? কম্পিটিশনটা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যটা যদি তুই বুঝতে পারিস সেটাই অনেক।”
“একদম ঠিক বলেছ।” আমার কথায় সায় দিলো শাহিদা। বলল, “১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার আব্বাকেও তারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। অমানবিক অত্যাচার করেছিল তাঁর ওপর। শেষ পর্যন্ত তারা আব্বাকে মেরে ফেলে। এরপর থেকে সরকারের দেওয়া ভাতা আর আব্বার রেখে যাওয়া সামান্য সম্পত্তি দিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে আম্মা অনেক কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন। আম্মা সবসময় চাইতেন আমি যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, একটা ভালো চাকরি করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি তাঁর কষ্টের ফসল দেখে যেতে পারেননি। আমি কলেজে থাকতেই আম্মা মারা যান।”
শাহিদার চোখ ছলছল করে উঠল। ইরফান আর আফরা দুপাশ থেকে ওকে জড়িয়ে ধরল। লক্ষ করলাম শাহিদার চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
এরপর আর গাড়িতে তেমন কথা হলো না। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম থাকায় রাত আটটার সময় বাড়িতে পৌঁছলাম। বাড়িতে ঢুকতেই দেখতে পেলাম ছোট চাচা ইকরাম ইসলামকে। চাচাকে সালাম দিয়ে আম্মার কথা জিজ্ঞেস করলাম। চাচা জানালেন আম্মার অবস্থা খুব একটা ভালো না। আমি আর বিশ্রাম নিতে পারলাম না। গাড়ি নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আলিফকে ফোন করে হাসপাতালের সামনে দাঁড়াতে বললাম।
হাসপাতালে সামনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই আলিফ ছুটে এলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে বললাম, “আলিফ, আম্মার কী খবর? এখন কেমন আছেন?”
আলিফ কিছু একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। দৌড়ে হাসপাতালের ভেতরে চলে আসলাম।
রিসিপশনে একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোককে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “বেগম সুফিয়া খাতুন কোন ওয়ার্ডে আছেন?”
ততক্ষণে আলিফ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই আলিফ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “চলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। ভাইজান, আম্মার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। ডাক্তার সাহেব বলেছেন,” আরিফের গলা ভারী হয়ে গেছে। কথাটা বলতে গিয়ে আটকে গেল। বুঝতে পারলাম কোনো খারাপ সংবাদ আছে। নিজের মনকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলাম। এরপর আলিফের দুই হাত চেপে ধরলাম। প্রশ্ন করলাম, “ডাক্তার সাহেব কী বলেছেন?”
আলিফ কোনোমতে বলল, “আম্মার খুব বিরল একটা রোগ ধরা পড়েছে। বিদেশেও এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তিনি আর তিন দিনের বেশি বাঁচবেন না।”
আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। আমার মাথা কাজ করছে না। এই কয়েক মাস আগে যখন বাড়িতে এসেছিলাম, কী হাসিখুশিই না ছিলেন আম্মা! হঠাৎ করে কীভাবে একটা মানুষের শরীরের এত অবনতি হতে পারে?
আলিফ আর কান্না চেপে রাখতে পারল না। আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল সে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। আমার চোখ দুটোও ঝাপসা হয়ে এলো। ভেবে পেলাম না এখন আমাদের কী করণীয়।
দুজনে আম্মার ওয়ার্ডের সামনের একটা সিটে এসে বসলাম। এমন সময় একজন ডাক্তার এসে বললেন, “আলিফ সাহেব একটু শুনবেন?”
আলিফ উঠে গিয়ে তাঁর সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল। ডাক্তার সাহেব চলে গেলে ও আমার পাশে এসে বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী বললেন ডাক্তার সাহেব?”
আলিফ বলল, “ডাক্তার সাহেব বললেন আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে। এই দুর্দিনে আশা হারিয়ে ফেললে তার পরিণতি খুব ভয়ানক হতে পারে। আম্মা জানেন যে তিনি আর হয়তো তিনদিনের বেশি বাঁচবেন না। কিন্তু আম্মা যদি এখন বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলেন তাহলে হয়তো তাঁকে সর্বোচ্চ আর একদিন বাঁচানো সম্ভব হবে। বেঁচে থাকার ইচ্ছাই এখন আম্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। আর আমরা যদি এখন ভেঙে পড়ি, তাহলে আম্মার বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই তো মরে যাবে। আমাদের এখন শক্ত থাকতে হবে ভাইয়া। আম্মাকে কোনোমতেই আশা হারাতে দেওয়া যাবে না।”
আমি সব শুনে বললাম, “ডাক্তার সাহেব ভুল কিছু বলেননি। শোন, আমরা এখন থেকে আম্মার সামনে খুব হাসিখুশি থাকব। আম্মাকে কোনো দুশ্চিন্তা করতে দেবো না। ঠিক আছে?”
আলিফ আমার কথায় সম্মতি জানাল। এরপর আমরা দুজনে আম্মার সাথে দেখা করতে গেলাম। আম্মা আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন।
বললেন, “আরিফ, বাবা আমার! এতদিন কোথায় ছিলি? এই বুড়িটাকে তো ভুলেই গেছিস।”
আমি আম্মার পা ছুঁয়ে সালাম করে বললাম, “আম্মা, এসব কী বলছেন বলুন তো! সন্তান কীভাবে নিজের মাকে ভুলতে পারে?”
আম্মা বললেন, “সে তো বটেই। আচ্ছা, আমার নাতি-নাতনিরা কেমন আছে? কতদিন দেখি না ওদের। ওরা এসেছে তো তোর সঙ্গে? আর বড় বৌমা কেমন আছে?”
“ওরা সবাই ভালো আছে। কিন্তু ওরা খুব ক্লান্ত, তাই ওদের বাড়িতে রেখে এসেছি। কাল ভোরে ওদের নিয়ে আসব না হয়,” বললাম আমি।
বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ আম্মার সাথে গল্প করলাম। আলিফ এর স্ত্রী সন্তানদের খবরও নেয়া হলো। কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিয়েছিলাম ডাক্তারের করা সে ভয়ানক ভবিষ্যদ্বাণীর কথা। শুধু আমি নই, আম্মা আর আলিফও যেন মনের অজান্তেই ভুলে গেছে সেই কথা। সত্যিই তো! এত হাসি-খুশি, প্রাণ চঞ্চল একটা মানুষ কীভাবে এত কম দিন বাঁচতে পারে এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু ঐ দুঃসংবাদটার কথা মনে পড়তেই শিউরে উঠলাম। খুবই বিচলিত হয়ে পড়লাম আমি।
আম্মা সেটা বুঝতে পেরে বললেন, “বাবা রে, তোরা আমার সন্তান, আমার গর্ব। জানি, আমি আর বেশি দিন বাঁচব না। কিন্তু সেই নিয়ে যদি তোরা দুশ্চিন্তা করিস, আমি যে তাহলে শান্তিতে মরতে পারব না। আর ডাক্তার সাহেব আমায় বলেছেন মনের ভেতর আশা ধরে রাখতে। এখন তোরাই যদি ভেঙে পড়িস, আমি কীভাবে বাঁচব বল তো?”
আমি বললাম, “আম্মা, দয়া করে এমন কথা বলবেন না।”
আম্মা বললেন, “আচ্ছা, বেশ। বলব না। কিন্তু তোরা আমাকে একটা কথা দিবি?”
আমি আর আলিফ জিজ্ঞেস করলাম, “কী কথা আম্মা?”
আম্মা জবাবে বললেন, “১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন মুজিব ভাই তাঁর সেই রক্ত গরম করা ভাষণ দেন তখন তোদের আব্বা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে সময় আলিফ আমার পেটে। তোদের আব্বা যাওয়ার আগে আমায় বলেছিলেন, ‘‘সুফিয়া চিন্তা করো না। আমার কিচ্ছু হবে না। ইনশাআল্লাহ, একদিন এই দেশকে স্বাধীন করে ঘরে ফিরব।’’ তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে তিনি অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসবেন। আমিও কথা দিয়েছিলাম তার জন্য আমি অপেক্ষা করব। তারপর নয় মাস কেটে গেল। যুদ্ধ শেষ হলো। স্বাধীন দেশে আলিফ জন্ম নিল। কিন্তু তোদের আব্বা আর এলেন না। অনেকে বলেছিল তিনি শহিদ হয়েছেন। তাহলে তো তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার কথা। কিন্তু না, সেটা পাওয়া যায়নি। আমি জানি, তোদের আব্বা বেঁচে আছেন। দেখিস তোরা, একদিন তিনি ঠিক ফিরে আসবেন। বাবারা, আমাকে কথা দে। আমি যদি মরে যাই তাহলে তোদের আব্বা যখন ফিরে আসবেন তখন তোরা তাঁকে বলবি যে তোদের আম্মা তার কথা রেখেছিল। মরার আগ পর্যন্ত সে তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছিল।
আম্মা কাঁদতে লাগলেন। আলিফের চোখ দুটোও ছলছল করছে। ছোটবেলা থেকে আম্মা আমাদের অনেক গর্ব করে বলতেন, ‘‘এদেশ স্বাধীন হয়েছে তোদের আব্বার জন্য। উনি ফিরে এলে তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করবি।’’ আমরা সবসময় ভাবতাম আব্বা হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবেন। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু আব্বা আর ফেরেননি। তখন মনে হতো, হয়তো অন্যদের কথাই ঠিক, আব্বা শহিদ হয়েছেন। তবে আম্মা কখনোই সে-কথা বিশ্বাস করতেন না। তাই আমরা দুই মা-ভক্ত ছেলেও নিজেদের মায়ের কথাকেই বেদবাক্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম আব্বা একদিন ফিরবেন। কিন্তু আমাদের এই কল্পনা কল্পনাই রয়ে গেল। আব্বা এলেন না।
আমি আম্মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। আলিফও আমাদের জড়িয়ে ধরল। রাতটা হাসপাতালেই কাটালাম। পরদিন ভোরবেলা উঠে ফজরের নামাজ পড়ে গাড়ি নিয়ে আমি আর আলিফ বাড়ি ফিরলাম। দুঃসংবাদটা শোনার পর কেউই বিশ্বাস করতে চাইছিল না। কিন্তু নিয়তির কাছে সবাই অসহায়। সবাইকে মানসিকভাবে শক্ত হতে বললাম। যদিও জানি না আমি নিজে কতটা শক্ত থাকতে পারব। সকাল সাতটা বাজার আগেই সবাইকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলাম। টের পেলাম, কারোর মনের অবস্থাই ভালো না। ভালো না থাকাটাই অবশ্য স্বাভাবিক। আমার মাথায় শুধু একটা বিষয় ঘুরছে, আজকের পর আর মাত্র দুটো দিন। এরপরই ভাগ্যের নির্মম লিখনকে মেনে নিতে হবে আমাদের। আর কিচ্ছু করার থাকবে না।
ইরফান, আফরা আর আলিফের দুই ছেলে লাবিব আর তামিম একসাথে আম্মার ওয়ার্ডে গেল তাঁর সাথে দেখা করতে। লাবিব ইরফানের সমবয়সী আর তামিম পড়ে ক্লাস এইটে। আমি আর আলিফ দরজার সামনে পায়চারি করছি। শাহিদা আর তার ছোট জা ফাহমিদা সামনের সিটটাতে বসে আছে। আজ শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শাহিদার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। সকাল থেকেই খেয়াল করছিলাম শাহিদা বেশ খানিকটা অন্যমনস্ক। আমরা যখন আম্মার ব্যাপারে ঐ দুঃসংবাদটা দিলাম তখন থেকে ও প্রচণ্ড মুষড়ে পড়েছে।
শাহিদার বাবা মানে আমার শ্বশুরমশাই ঢাকা শহরের বিখ্যাত সাংবাদিক ছিলেন। শুনেছি ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানিরা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর তারা একটা খুঁটিতে বেঁধে তাঁকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে বলে। তিনি রাজি না হওয়ায় পাকিস্তানিরা তাঁর উপর নৃশংস অত্যাচার চালায়। তারপরও ওরা যখন তাঁকে দিয়ে ঐ কথা বলাতে ব্যর্থ হয় তখন তারা শাহিদার বাবাকে গুলি করে হত্যা করে। ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় তার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। শাহিদা পরের বছর জানুয়ারি মাসে জন্ম নিয়েছিল। পরম আদরে তাকে বড় করেছিলেন তার মা। কিন্তু শাহিদা কলেজে থাকাকালীন তিনি মারা যান। তাই বিয়ের পর আমার মাকে পেয়ে শাহিদা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গিয়েছিল। নিজের মায়ের মতো ভালবাসতে শুরু করে আম্মাকে। তাদের সম্পর্কটা শাশুড়ি-বৌমা থেকে দ্রুত মা-মেয়ের সম্পর্কে পরিণত হয়।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে যখন পায়চারি করছি এমন সময় ওয়ার্ডের ভেতর থেকে আফরার গলা শুনতে পেলাম, “দাদু শোনো, আমি বলছি, তোমার কিচ্ছু হবে না। ডাক্তার আঙ্কেল এমনিই ওসব কথা বলেছেন।”
আম্মা মুচকি হেসে বললেন, “জানি তো সোনা। আমাকে তো বেঁচে থাকতেই হবে। নাহলে তোরা কাকে দাদু বলে ডাকবি বল তো?”
“হ্যাঁ, সেটাই তো। আর তুমি না থাকলে আমাদের ভূতের গল্পই বা কে শোনাবে?” বলল তামিম।
বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ তাদের কথোপকথন চলল। বাচ্চারা বের হওয়ার পর আমরা বড়রা চারজন ভেতরে ঢুকলাম। আম্মাকে আমরা পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। আম্মা কে কেমন আছে, সেই খোঁজখবর নিলেন। এরপর বললেন, “বড় বৌমা, আজ তো ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ। তোমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। বাড়িতে যাবে না?”
“না, মা,” জবাব দিলো শাহিদা। বলল, “ঐ বাড়িতে তো আমার মা-বাবা কেউই নেই। এখানে তো অন্তত মা বলে ডাকার একজন আছে।”
“তা তো বটেই,” আম্মা বললেন। “তবে বৌমা, তোমার আব্বা কিন্তু তোমার গর্ব। এই দেশকে তিনি নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। তা না হলে কী করে একটা মানুষ শত অত্যাচারের মুখেও পাকিস্তানিদের জয়গান করা থেকে বিরত থাকে? নিজের জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি নিজের মাতৃভূমির প্রতি অনুগত ছিলেন। এমন দেশপ্রেমী এদেশে কতজনই বা আছে?”
শাহিদার মুখ দেখে বুঝলাম এক মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে তার মনের ভেতর। গর্ব ও শ্রদ্ধার সাথে খানিকটা কষ্ট আর অভিমানের মিশেলে তৈরি বিচিত্র এক অনুভূতি!
বাকিটা দিন এত দ্রুত কীভাবে কেটে গেল বলতে পারব না। তবে প্রতিনিয়ত মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর মাত্র দুই দিন! রাত আটটার দিকে আম্মাকে ওয়ার্ড থেকে হাসপাতালের ক্যান্টিনে নিয়ে এলাম। অল্প সময়ের মধ্যে বাচ্চাদের নিয়ে ফরিদা ফুফুও চলে এলেন। ততক্ষণে ইকরাম চাচাও হাসপাতালে চলে এসেছেন। এতদিন পর সবাই এক টেবিলে বসে খেতে খুব ভালো লাগল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অনেকক্ষণ ধরে আমরা গল্পগুজব করলাম। দেখতে দেখতে আরও একটা দিন চলে গেল।
ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ, শুক্রবার। দুপুরে আমরা ছেলেরা একসাথে মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষে আম্মার জন্য অনেকক্ষণ দোয়া করলাম। হাসপাতালে ফিরে জানতে পারলাম আম্মার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা নাড়াতে পারছেন না। হতবাক হয়ে গেলাম আমি। আম্মার ওয়ার্ডে ঢুকে দেখলাম আম্মা শুয়ে আছেন।
আম্মা আমাকে দেখেই বললেন, “আরিফ বাবা, আমি তো আর বেশি দিন বাঁচব না। তবে বিশ্বাস কর, আমার কোনো আক্ষেপ নেই। তোদের দুজনকে আমি মানুষ করতে পেরেছি, এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে! কিন্তু তোর আব্বাকে যদি এই মৃত্যুশয্যায় শেষবারের মতো দেখে যেতে পারতাম তাহলে হয়তো মনে শান্তি নিয়ে মরতে পারতাম। তবে ডাক্তারবাবুর কথামতো আমি যদি কাল মারা যাই, তাহলে নিজের মনে অন্তত একটা সান্ত্বনা পাব যে, আমি বিজয় দিবসে মরেছি; এদেশের বিজয়ের দিন মরেছি; তোর আব্বার বিজয়ের দিন আমি মরেছি। আমার আর কীসের আফসোস?”
আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। আম্মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। সেদিন অনেক মুরব্বি, হুজুররা হাসপাতালে এসে পবিত্র কোরআন শরীফ পড়ে আম্মার জন্য দোয়া করলেন। গ্রামের অনেকে এসে আম্মার সাথে দেখা করে গেলেন। মনে মনে ভাবছি, তবে কি সত্যিই আম্মা আর একদিন বাঁচবেন?
সেদিন রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারলাম না। সারারাত নামাজ আর দোয়া-দরুদ পড়ে কান্নাকাটি করলাম। শেষ রাতে যখন চোখটা হালকা একটু লেগে এসেছিল এমন সময় ফজরের আজান কানে এলো। সাথে সাথে উঠে বসলাম আমি। তড়িঘড়ি করে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি আম্মা উদাস চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন।
তাঁকে সালাম করে জিজ্ঞেস করলাম, “আম্মা শরীরটা কেমন লাগছে?”
আম্মা উত্তর দিলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো লাগছে বাবা।”
“হাত-পা নাড়াতে পারছেন এখন?” প্রশ্ন করলাম আমি।
“নাহ, হাতে-পায়ে গতকাল থেকে যে কী হলো, পুরো অবশ হয়ে গেছে,” আম্মা বললেন।
আমি বললাম, “আপনি একদম চিন্তা করবেন না। ডাক্তার সাহেব আপনাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলবেন।”
আম্মা মৃদু হেসে বললেন, “মরেই তো যাব। এখন আর আমার হাত-পা নাড়িয়ে কাজ কী?”
আম্মার হাসিমুখটা দেখে হঠাৎ এক অজানা বিয়োগ-ব্যথায় আমার অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। মনে হলো আম্মাকে কি আজকের পর আর কখনো হাসতে দেখব?
আমি সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। ফজরের নামাজ পড়ে সবাই মিলে আমাকে দেখতে গেলাম। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই এসেছেন তাঁকে দেখতে। আম্মা খুব শান্তভাবে কথা বলছেন। কিন্তু তাঁর চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা লক্ষ করলাম।
এমন সময় একটা মহিলা কণ্ঠ হঠাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠল, “ভাবি তো আতাহার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদটা আজ পর্যন্ত বিশ্বাস করলেন না।”
কণ্ঠটা অনুসরণ করে ভিড়ের মাঝে তাকাতেই চোখ পড়ল জেবা চাচির উপর। তিনি ইকরাম চাচার স্ত্রী।
আম্মা উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আরিফের আব্বা মরেন নাই! তার মৃত্যুর কী প্রমাণ আছে?”
বেশ কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা। তারপর আবার মানুষের গুঞ্জনে পুরো ওয়ার্ডটা ভরে উঠল।
আম্মা একটা সময় বললেন, “আরিফের আব্বা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। নিজের দেশের জন্য তিনি সব করতে রাজি ছিলেন। তিনিই আমাকে এই দেশ, এদেশের মানুষকে নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছেন, তাদের ভালবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি সবসময় বলতেন, “আমার সন্তানরা একদিন এই দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে।” আমি তাকে নিয়ে সবসময় গর্ব করতাম, আজও করি।”
জেবা চাচির মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হলো না। কিছুক্ষণ পর আমরা প্রায় সবাই যখন সকালের নাশতা করতে বাইরে এসেছি তখন হঠাৎ আম্মার চিৎকার শুনে দৌড়ে ভেতরে আসলাম। বিছানার কাছে এসে নিচু হয়ে দেখতে পেলাম আম্মার চোখ দুটো বিস্ফারিত। মুখটা খানিকটা খোলা। একটা হাত বুকের ওপর।
আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে গেছে। গলা থেকে একটা আওয়াজও বের হচ্ছে না। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। ইয়া আল্লাহ! নিয়তির কাছে এভাবে হেরে গেলাম আমরা! এই সমগ্র বিশ্বে আম্মাই একমাত্র মানুষ ছিলেন যাঁকে সারা জীবন নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেছি, নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছি। কিন্তু এর বিনিময়ে কখনো ঠকতে হয়নি। ছোট থেকে সবসময় আম্মা আলিফ আর আমাকে আমাদের বাবার আদর্শ মেনে চলতে বলতেন। আমি সরকারি চাকরিটা পাওয়ার পর আম্মা খুব খুশি হয়েছিলেন। আম্মা সবসময় চাইতেন আমরা দুই ভাই যেন সারাজীবন দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করি।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠল ‘ইন্নালিল্লাহ’ ধ্বনিতে। কান্নার রোল পড়ে গেল চারদিকে। আমার চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ছে। ঐ দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে আমি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এলাম।
কখনো ভাবিনি, যে মানুষটা আমাদের জন্য এত কিছু করল সেই মানুষটাই একদিন এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। আম্মা আব্বাকে অনেক ভালবাসতেন, নিজের থেকেও বেশি। তাই সম্ভবত আল্লাহ তাঁর মৃত্যুটা এই দিনেই লিখেছিলেন। কিন্তু আব্বা? তিনি আজও কেন ফিরলেন না? জানি না। কোনোদিন ফিরবেন কিনা তাও জানি না। হয়তো আম্মার কথা অনুযায়ী একদিন তিনি ফিরবেন।
মাতৃকা আরজমীর
ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ